Breaking News :

করোনার বিরুদ্ধে ‘ইমিউনিটি’ গড়ে তোলা ছাড়া উপায় নেই

বাংলাদেশে সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী করোনায় ১০,৯২৯ জন আক্রান্ত, সুস্থ্য ১,৪০৩ জন, মৃত্যু ১৮৩ জন। বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হয়েছিল আটান্ন দিন আগে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ৭৮৮, যা এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক শনাক্ত হওয়া রোগী।

বাংলাদেশের শীর্ষ ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস মহামারির প্যার্টান বা আক্রান্তের সংখ্যা নির্দেশকারী গ্রাফে এর ওঠানামার চিত্রটা দেখলে দেখা যাবে, ২০শে এপ্রিল ৪৯২ জনের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। দৈনিক আক্রান্তের এই হার ওঠানামা করে এখন ৭০০ পার হয়ে প্রায় ৮০০ এর কোঠায় পৌঁছেছে। কিন্তু কিছুদিন আগেও এই সংখ্যা ৫০০ এর ঘরে ছিল, এখন তা ৭০০ পার হয়ে প্রায় ৮০০ এর ঘরে এসে গেছে। দিনে দিনে এই কার্ভটা (গ্রাফে আক্রান্তের রেখাচিত্র) উঠে যাচ্ছে।

অন্যদিকে এক পরিসখ্যানে দেখা যাচ্ছে সমস্ত আক্রান্ত লোকের ৫৫% ঢাকার ভিতরের মানুষ। আর সব আক্রান্তের ৮৭% ঢাকা বিভাগে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, ঢাকায় লকডাউন খুব কঠোরভাবে আরোপ করার পরও দেখা যাচ্ছে ঢাকাতেই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি জানান, আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকবে। এটি কমার কোন লক্ষণ এই মুহুত্বে নেই।

তিনি জানান, বাংলাদেশে গত ২৮শে এপ্রিল ২০২০ইং গার্মেন্টস খুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দলে দলে মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। এর প্রভাব আমরা এখন দেখতে পাব না। আগামী ১২ই মে থেকে পুরোপুরি এর প্রভাব দেখতে পাব।

তিনি আরোও জানান, এই মুহুত্বে দোকান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে। ইতিমধ্যে সরকার দোকান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার চিন্তা করছেন যা হিতে বিপরীত হবে আমাদের জন্য এবং তার প্রভাবে এই গ্রাফ আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয় কবে নাগাদ বাংলাদেশ করোনা ঝুঁকি থেকে মুক্তি পেতে পারে- তিনি জানান, এটি যেহেতু সারা পৃথিবীব্যাপী তান্ডব চালাচ্ছে এবং পুরো অর্থনীতির চাকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সেহেতু সারা পৃথিবীর মত বাংলাদেশের মানুষও গভীর উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছে কবে সকলেই এই শঙ্কা-মুক্ত হবে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করছেন এই সংক্রমণ যদি অব্যাহত থাকে তাহলে “হার্ড ইমিউনিটি” না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া মানুষের কোন উপায় নেই।

হার্ড ইমিউনিটি কি এবং কিভাবে তা কাজ করে? তিনি জানান,
– কিছু লোক মারা যাবে এবং অনেক মানুষ ইমিউন (প্রাকৃতিকভাবে ভাইরাস প্রতিরোধী) হয়ে যাবে।
– মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠলে তবেই এই ভাইরাস থেকে ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা চলে যাবে ।

তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, এই ভাইরাস যদি এর মধ্যে মিউটেট করে (আচরণ পরিবর্তন করে), তাহলে মানুষ আরোও বিপদে পরে যাবে। করোনা ভাইরাস মিউটেট করলে সেটা নতুন ভাইরাসে পরিণত হয়ে যাবে।

এর ফলে বড়ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে আমাদেরকে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন তৈরি করা হচ্ছে মূলত করোনা ভাইরাসের নির্দষ্ট আচরণের উপর ভিত্তি করে। যদি ভাইরাস আচরণ পরিবর্তন করে নতুন ভাইরাসে রুপান্তরিত হয় তবে ভ্যাকসিন কাজে আসবেনা।

ভ্যাকসিন বা ঔষধ আমরা কেন ব্যবহার বা প্রয়োগ করি? ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার মানে হল কৃত্রিম উপায়ে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়ানো। তবে কেউ যদি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে থাকে তাহলে স্বাভাবিক নিয়মে তার শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠে।

তিনি জানান, যেহেতু এই মুহুত্বে করোনা ভাইরাসের কোন ভ্যাকসিন আবিস্কার হয়নি। সেহেতু ইমিউনিটি ছাড়া আমাদের আর কোন অস্ত্র নাই। এই ভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটির ওপর ভরসা করেই থাকতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে উচ্চ মানের লকডাউন আরোপ করা সম্ভব না। লকডাউন কাগজে কলমে হলেও বাস্তবে লকডাউন কেউই মানে নি। আমরা প্রায় দেড় মাসের মতো চেষ্ঠা করেছি। কিন্তু কোন ভাবেই মানুষকে ঘরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সবাই চেষ্টা করেছে। পুলিশ চেষ্টা করেছে, আর্মি চেষ্টা করেছে, ভলান্টিয়াররা চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমরা সবাই ব্যার্থ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই রোগ মোকাবেলার একমাত্র উপায় মানুষের মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হওয়া, সরকারকে সেটা মানতে হয়ত বাধ্য হতে হবে।

তিনি আরোও বলেন, আমেরিকা বা ইতালিতে কর্তৃপক্ষ যেভাবে লকডাউন কার্যকর করতে পারে, বাংলাদেশ সেভাবে এই লকডাউন কার্যকর করতে পারছে না। এর কারন হলো বাংলাদেশে মানুষজনের যে বিহেভিয়ার‍্যাল প্যার্টান (আচরণের ধরন) আর বাংলাদেশ সরকারের যে সক্ষমতা, এই দুটা যদি চিন্তা করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের সরকার এইরকম আচার-ব্যবহারওয়ালা জনগোষ্ঠিকে প্রকৃতভাবে লকডাউন করাতে পারবে বলে মনে হয় না।”

বাংলা ক্যালেন্ডার