Breaking News :

উইঘুররা চীনাদের সঙ্গে সাহসিকতার চরম রূপ দেখিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে

সাল ১৯৭১ তারিখ ২৫শে মার্চ হয়তো সেই সময় এর কথাটি তখন যারা প্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন  তাদের মনে আছে। হ্যাঁ ঐ রাতটি বাংলাদেশর জন্য একটি ভয়াবহ রাত ছিল। হঠাৎ সশস্ত্র অবস্থায় নীরিহ নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষের উপর হামলা চালায় পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী। যাকে যেখানে পায় সেখানেই হত্যা বা শহীদ করা হয়। কিন্তু এখন যে ঘটনাটি রিখবো এটি একটু অন্য রকম কিন্তু ভয়াবহতা খুবই নির্মম। সেদিন পাকহানাদার বাহিনী প্রতিটি ঘরে ঘরে তল্লাশি চালায় এভাবে এটি একটি নিয়মে পরিনত হয়। একসময় ঘরও যেন তখন নরকে পরিনত হয়।  মনে করেন বর্তমানে সেইদিনটির মতো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আপনার বাড়িতে ঢুকে প্রিয়জনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের রাখা হচ্ছে ক্যাম্পে। সন্তানদের ধরে নিয়ে রাখা হচ্ছে ক্যাম্পে। কেমন লাগবে আপনার। হ্যাঁ এটি বর্তমান চীনের উইঘুর সম্প্রদায়ের অবস্থা।

এ বছরের আগস্টে (২০১৯) জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, প্রায় ১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ কেন্দ্রগুলোয় আটক রাখা হয়েছে। ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বিবেচনার শিবিরে’ অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে। চীন সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কমিটির প্রতিবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদও জানায় সি চিন পিংয়ের দেশ। তাহলে আসল ঘটনাটি কি? জাতিসংঘ কি চীনের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগন্ডা ছড়াচ্ছে? আসুন তাহলে সত্য ঘটনাটি আমরা একটু ভালো করে জানি-

রুকিয়ে তুরদুশ একজন উইঘুর কর্মী। চার বছর ধরে তিনি নিয়মিত তুরস্ক ও চীনে যাতায়াত করেন। তিনি উইঘুর কানাডা সোসাইটির সাবেক সভাপতি। পাশাপাশি গয়নার ব্যবসা করেন। ২০১৭ সালের দিকে কোন কারন ও ব্যাখ্যা ছাড়াই গ্রেপ্তার হন তাঁর পরিবারের সদস্যরা । কোন কারন ছাড়াই চীন সরকার তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। তাঁর স্ত্রীকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করেছে চীনের সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী। তুরদুশ জানেনও না তাঁর দুই সন্তান কোথায়? এটি কোন বানানো বা ছবির কাহিনী নয় এটি চীনের বর্তমান অবস্থা। রুকিয়ে তুরদুশের এ গল্প শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো উইঘুরের প্রায় সবার জীবনের এক সুতায় গাঁথা গল্প। গল্পের স্থান, উপাদান, পাত্র, কাল হয়তো আলাদা, কিন্তু পরিণতি সবার একই। পুরো বিশ্বের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই, সবাই যেন দেখেও না দেখার ভান করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও প্রায় নীরব। যেমনটি আমরা দেখছি সাংবাদিক জামাল খাসোগি ও সিরিয়ায় হাজার হাজার মানুষ হত্যার মতো ঘটনায়।

আসলেই উইঘুরা কী চীনের জন্য হুমকি নাকি এটি একটি ধর্মীয় ইস্যু। শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার দরুন কী উইঘুরদের উপর এমন অমানবিক অত্যাচর হচ্ছে। এই কারনেই কি বিশ্ব দেখেও না দেখার ভান করে আছে। রুকিয়ে তুরদুশরা শান্তি, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা চান। তুরদুশের মতো যাঁরা চীনের বাইরে থাকেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না, তাঁরা চীনে শান্তির জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করছেন এবং এটি প্রমানিত।

purebangla.com

উইঘুর  জাতির ইতিহাস সামান্য কয়েকটি দিনের নয়। এই জাতির ইতিহাস হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস।  উইঘুর জাতির ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছর আগের। মূলত, উইঘুর  অধিবাসীরা স্বাধীন পূর্ব তুর্কিস্তানের অধিবাসী। পূর্ব তুর্কিস্তান প্রাচীন সিল্ক রোডের পাশে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার একটি দেশ, যার চতুর্পাশ্বে চীন, পাকিস্তান, ভারত, মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান,  ও রাশিয়ার অবস্থান। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশেই উইঘুর সম্প্রদায়ের বাস রয়েছে।

ভাষাবিদ ও ইতিহাসবেত্তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন যে ‘উইঘুর’ শব্দটি ‘উয়্যুঘুর’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ সংঘবদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রাচীন এ সম্প্রদায়ের লোকদের উইঘুর না বলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো। ১৯২১ সালে উজবেকিস্তানে এক সম্মেলনের পর উইঘুররা তাদের পুরোনো পরিচয় ফিরে পায়। 

মধ্যযুগে তাং সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার পর থেকেই সেখানে ইসলাম ও আরবের প্রভাব বাড়তে থাকে। স্থানীয় উইঘুর জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। উইঘুর বললেই আজকে মুসলিম জনগোষ্ঠী বোঝানো হয়। অন্যদিকে, চীনা মুসলমানদের হুই বলা হয়। উইঘুরের বর্ণমালাও আরবি। সাংস্কৃতিক দিক থেকে এরা তুর্কি ও আরবি প্রভাবিত। উরুমকি বর্তমান জিনজিয়াংয়ের রাজধানী। কাশগড় অন্যতম বৃহৎ শহর। জিনজিয়াং একটি প্রধান ফসল উৎপাদন কেন্দ্র। এখানে বিপুল পরিমাণ খনিজ ও তেলসম্পদ মজুত রয়েছে। 

জেনে রাখা ভালো, উইঘুররা কারও করুনার পাত্র ছিলেন না এবং তারা হলো বীরের জাতি। এই লেখাটি শুরু করার পূর্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি কথা দিয়ে শুরু করা হয়েছিল কেন করা হয়েছিল এই লাইনটি পড়লে হয়তো পাঠক আরোও ভাল ভাবে বুঝতে পারবেন। আজ থেকে প্রায় ১শত ৮ বছর আগে ১৯১১ সালে মাঙ্কু সাম্রাজ্য উৎখাতের মাধ্যমে পূর্ব তুর্কিস্তানে চীনা শাসন চালু হয়। কিন্তু স্বাধীনচেতা বীর উইঘুররা এই বৈদেশিক শাসনের সামনে মাথা নোয়ায়নি। স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার আশায়  ১৯৩৩ ও ১৯৪৪ সালে তারা দুবার চীনাদের সঙ্গে সাহসিকতার চরম রূপ দেখিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তাদের ভাগ্য তাদের অনুকূলে ছিল না। এ কারণে ১৯৪৯ সালে আবারও তারা চীনা কমিউনিস্টদের হাতে পরাজিত হয় আর জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ গড়ে ওঠে। তখন সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির গভর্নর ছিলেন সাইফুদ্দিন আজিজি। সেই থেকেই উইঘুরদের জীবনে নেমে আসে ভয়ানক কঠোরতা যা আজো জারি রয়েছে।

purebangla.com

সিআইএর ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্ট বুক অনুযায়ী চীনের মোট জনসংখ্যার ১ থেকে ২ শতাংশ মুসলিম। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, মুসলিমরা চীনা জনসংখ্যার ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০৯ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, এসব দেশের মধ্যে চীনের জিনজিয়াংয়ে ১ কোটি ২০ হাজারের মতো উইঘুর লোক বসবাস করে। উজবেকিস্তানে ৫৫ হাজার, রাশিয়ায় ৪ হাজার, কিরগিজস্তানে ৪৯ হাজার, কাজাখস্তানে ২ লাখ ২৩ হাজার, তুরস্কে ১৯ হাজার, ইউক্রেনে ১ হাজারের মতো উইঘুর লোক বাস করে।  জিনজিয়াং চীনের অন্যতম সর্ববৃহৎ একটি অঞ্চল। এর আয়তন ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার (বাংলাদেশের আয়তনের ১২ গুণ)। দেশটির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এ এলাকা আয়তনে চীনের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। এর পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে আছে মুসলিম দেশ কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও কাজাখস্তান; আর দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে জম্মু-কাশ্মীর ও আফগানিস্তান। জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের মতো। এর মধ্যে মুসলমান প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ। প্রায় ৫৮ শতাংশ মুসলিম।

চীন রাষ্ট্রীয়ভাবে উইঘুরদের ধর্মীয় পরিচয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। ২০১৬ সালে ‘মেকিং ফ্যামিলি’ নামের একটি উদ্যোগ চালু করে চীন। এর মাধ্যমে উইঘুর পরিবারকে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে পাঁচ দিনের জন্য তাদের ঘরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের হোস্ট করতে বাধ্য করে। এটি সম্পূর্নভাবে ধর্ম বিরুধী কাজ এবং যেকোন ধর্মের জন্য এটি অপমানজনক। চীন সরকার উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনের জন্য তিনটি অভিযোগ ব্যবহার করেছে—চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। প্রথম অভিযোগ, যেকেউ গৌরব প্রকাশ করে তাদের উইঘুর পরিচয় প্রকাশ করে। আবার শিক্ষাশিবিরে পাঠানো লাখো বিশিষ্ট উইঘুর ব্যক্তিত্ব গত কয়েক বছরে আটক বা অদৃশ্য হয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে আছেন ইসলামি চিন্তা ও শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ সালিহ হাজিম, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাউদ, অর্থনীতিবীদ ইলহাম তোকতি, ফুটবল খেলোয়াড় এরফান হিজিম, পপশিল্পী আবদুর রহিম হায়াত প্রমুখ। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিহিঃবিশ্বে এ নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই।

ধর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘুদের ভাষাশিক্ষা নিষিদ্ধ করার চীনা নীতি জিনজিয়াংয়ে অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ। ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ধর্মীয় ক্ষেত্রে উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীন নানাভাবে অন্যায় অত্যাচার করছে।

বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, উইঘর বন্দি শিবিরে বন্দীদের মান্দারিন ভাষা শিখতে বাধ্য করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা এবং তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মনে রাখতে বাধ্য করা হয়। এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসেবে চীন সরকার সাংঘর্ষিকভাবে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই শিক্ষাশিবিরের পাশাপাশি উইঘুর শিশুদের ক্যাম্প ও স্কুল রয়েছে, যেখানে তাদের পরিবার, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। এগুলোকে বাস্তাবয়ন করার জন্য জিনজিয়াংয়ে স্থানীয় আইন পরিবর্তন করে শিক্ষা শিবিরের ‘চরমপন্থী মতাদর্শিক শিক্ষা’ বাস্তবায়নের অনুমতি দিয়েছে চীন।

ফ্রিডম ওয়াচের মতে, চীন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ধর্মীয় নিপীড়ক দেশ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকায় এসব নিপীড়নের গোঙানির শব্দ বিশ্ববাসী খুব একটা জানতে পারে না। কালেভদ্রে কিছু জানা যায়। উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নীতির ব্যাপারে চীন বলে যে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার মোকাবিলা করার জন্যই তারা নানান পলিসি নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু দাড়ি রাখা, রমজান মাসে রোজা রাখা কীভাবে ধর্মীয় চরমপন্থা, তা বিশ্ববাসীকে বোঝাতে ব্যার্থ্য হয়েছে। আসলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান তাদের মতে চরমপন্থা। আর এই চরমপন্থা দমনের নামে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জেল-জরিমানা চলছে।

চীনের অর্থনীতির রমরমা অবস্থা এবং তাদের কাছ থেকে নানান সুবিধা পেয়ে অধিকাংশ মুসলিম দেশ এসবের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। চীনের বুদ্ধিজীবীরাও কথা বলেন না। কারণ, এঁদের অনেকেই মার্ক্সীয় তত্ত্ব, মাও তত্ত্ব ভর করে আছেন। আর মুসলিমদের ব্যাপারে বরাবরই মুসলিম সুশীল সমাজ বা আমরা একরকম অন্ধ। এসব মানুষের কান্না তাদের কানে যায় না। উইঘুর মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারা (সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী) কথা বলতে পারে না, কারণ তারা ‘বোবা’।

শুধুমাত্র মুসলিম বা মুসলমান হওয়ার জন্যই এতো বছর যাবৎ তারা নিপীড়ন সহ্য করে আসছে। জোড় করে মুসলমান নারীদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে অমুসলিম যুবকদেরকে বিয়ে করতে। আজ সমস্ত বিশ্ব দেখেও না দেখার ভান করে আছে। জাতি সংঘে এ নিয়ে কোন প্রতিবাদ করতে কোন মুসরিম শাসককে এখন পর্যন্ত দেখা যায় নি। এমনকি পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে জোড়ালো বক্তব্য দিলেও উইঘরদের নিয়ে কোন মন্তব্য করেন নি।

বাংলা ক্যালেন্ডার