Breaking News :

তারা ওই কন্টেইনারের নাম দিয়েছেন কফিন কন্টেইনার

লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের গ্রেইস শহরে পরিত্যক্ত একটি লরি থেকে গত বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে ৩৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। গত বুধবার নৌকায় বেলজিয়াম থেকে লন্ডনের গ্রেতে পৌঁছেছিলেন ওই চীনারা। এসেক্সের পুলিশ বলছে, তাদের তদন্তের প্রাথমিকভাবে জোর দেয়া হয়েছিল লরি থেকে উদ্ধারকৃতদের পরিচয় শনাক্ত করা। লরি থেকে লাশ শনাক্তের জন্য টিলবুরির কাছে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। এর আগে ২০০০ সালে লন্ডনের দক্ষিণাঞ্চলের দোভার বন্দর থেকে চীনের ৫৮ অভিবাসন প্রত্যাশীর লাশ উদ্ধার করা হয়। সে সময় চীনা এই নাগরিকরা নেদারল্যান্ডের একটি ট্রাক ভাড়া করে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরে ওই ট্রাক থেকে দু’জনকে জীবিত এবং বাকিদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

গত ‍বুধবারের ঘটনায় পাচারে জড়িত থাকার সন্দেহে স্ট্যানস্টেড এয়ারপোর্টে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ৪৮ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে। দেড়ীতে হলেও আস্তে আস্তে বেরিয়ে এসেছে সব কথা। এর পূর্বে এসেক্সের পুলিশ বলেছিল মারা যাওয়া সকলেই চীনের নাগরিক ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে কয়েকজন ভিয়েতনামের নাগরিক আছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কারন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে,  মারা যাওয়ার আগে ভিয়েতনামের একজন যুবতী ফাম থি ট্রা মাই তার মার কাছে ধারাবাহিক ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন। তাতে তিনি মাকে বলেছেন তিনি কতটা তার মাকে ভালবাসেন। মাকে লিখেছেন, তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। মারা যাচ্ছেন। মাই এর পরিবারের দাবি, ২৬ বছরের মাই উন্নত জীবনের আশায় চীন হয়ে বৃটেনে যাওয়ার জন্য পাচারকারীদের দিয়েছেন ৩০ হাজার পাউন্ড। ভিয়েতনামি এমন ১০টি  পরিবার আশঙ্কা করছেন তাদের স্বজনরাও রয়েছেন মৃতদের তালিকায়। নুয়েন দিনহ লুওংয়ের আত্মীয়রা বলেছেন, নিহতদের মধ্যে নুয়েন থাকতে পারেন। তারা বলেছেন, নুয়েনের বিষয়ে জানেন এমন দু’টি স্থান থেকে তারা জরুরি বার্তা পেয়েছেন। ভিয়েতনামের ১৯ বছর বয়সী একজন তরুণী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার আত্মীয়রা। তারা বলেছেন, মঙ্গলবার সকাল ৬টা ২০ মিনিটে তারা ফোন পেয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, ওই তরুণী কন্টেইনারে উঠছেন। তারপর থেকেই তার ফোন বন্ধ।

মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ওই কন্টেইনারবাহী লরির চালক মাউরিস মো রবিনসনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওয়ারিংটনের দম্পতি জোয়ানা মেহের (৩৮) ও তার স্বামী থমাস (৩৮)কে এই ষড়যন্ত্রে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর থেকে সর্বশেষ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে।

উল্লেখ্য- বেলজিয়াম হয়ে কন্টেনারটি ইংল্যান্ড ঢুকে এর পরই লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের গ্রেইস শহরে পরিত্যক্ত অবস্থায় কন্টেনারটি পাওয়া যায়। যখন মানুষগুলোকে ধাতব কন্টেইনারের ভিতর ঢুকানো হয় তখন এর তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এটির ভিতর ১জন শিশুসহ ৩৯ জন মানুষ। কিন্তু কিছুক্ষন পরই তাপমাত্রা আরোও কমে যাচ্ছিল। ফলে তারা সকলেই আর্তনাদ শুরু করেন। কেউ কেই দরজার হ্যান্ডেল ধরে ধাক্কাচ্ছেন বের হওয়ার জন্য। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই আস্তে আস্তে সকলেরই শরীর অসার হয়ে আসছে সেই সাথে সকলেই  অজ্ঞান হওয়ার পর্যায়ে পৌছে গেছেন। কিন্তু এতো কিছুর ভিতর কেউ কেউ বাড়িতে জীবন বাঁচানোর জন্য ম্যাসেজ পাঠান মোবাইলে। কিন্তু তাদের সেই আর্তনাদ ওই কন্টেইনারের বাইরের দুনিয়ার কোনো মানুষের কানে পৌঁছার মতো কোনো উপায় ছিল না। এ যেন এক কবরের জীবন যাকে পুলিশেরা কন্টেনার কফিন হিসেবে নাম দিয়েছেন।

শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে পানি জমে বরফ হয়। সেখানে মাইনাস ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে বাঁচা কোন মানুষের পক্ষে অসম্ভব! ফলে কঠিন এক ট্রাজেডি রচিত হয়েছে বৃটেনের এসেক্সে। গত বুধবার এ কাহিনী উদঘাটনের পর একের পর এক বেরিয়ে আসছে তথ্য। তা নিয়ে বৃটিশ মিডিয়া গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করছে। এতে ফুটে উঠেছে নিজেদের জীবনকে শতভাগ ঝুঁকির মুখে ফেলেও কিভাবে মানুষ বৃটেন বা ইউরোপ বা উন্নত দেশে পাড়ি জমাচ্ছে।

এদিকে কন্টেনারের ভিতরে তদন্ত করতে গিয়ে দরজার ভিতরে হ্যান্ডেলে রক্তাক্ত হাতের ছাপ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তারা ওই কন্টেইনারের নাম দিয়েছেন ‘কফিন কন্টেইনার’। বেলজিয়ামের জিব্রুজে একটি ফেরিতে উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল ওই মানুষসহ কন্টেইনার। তার ভিতরে আস্তে আস্তে তাপমাত্রা কমতে থাকে। এর শেষ অধ্যায় উন্মোচিত হয় এসেক্সের একটি বন্দর এলাকায়। খবরটি পুরো বিশ্বে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা হলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তেমন প্রতিবাদ দেখা যায় নি।

নিহত অভিবাসীদের মধ্যে ৬ জন ভিয়েতনামি রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সময় তাদের কাউকে নগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। কিছু মানুষের পরণে কোন পোষাকই ছিল না, কিছু কিছু মানুষের পবণে সামান্য পোশাক ছিল। তারা ছিলেন ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলীয় ক্যান লোক-এর বাসিন্দা। মারা যাওয়ার আগে তারা দরজায় ধাক্কা দিয়েছেন। আঘাত করেছেন বাইরের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে। কিন্তু না, ফ্রিজ যেমন হয়, ঠিক তেমনই। ভিতরের কোনো শব্দ বাইরে পৌঁছেনি। এর ফল বরফে জমে এক এক জনের করুন মৃত্যু। মানুষের জীবন এখন পশুর চেয়েও মূল্যহীন হয়ে গিয়েছে।

বাংলা ক্যালেন্ডার