Breaking News :

খাবার স্যালাইনে হতে পারে মৃত্যু

নিউজটি লেখার আগে বলে নেওয়া ভাল সমস্ত ঘটনাটি একজন ডাক্তার সাহেবের বাস্তব জীবন থেকে নেওয়া যে ঘটনাটি তার ডাক্তারী জীবনে খুবই হৃদয় বিদারক।
তিনি তার ফেইসবুক এ একটি স্ট্যাটাস লিখেন-  স্ট্যাটাসটি হুবহু আপনাদের মাঝে তুলে ধরা হলো- ডায়রিয়ায় আক্রান্ত তার কাছে আসা এক ছোট্ট শিশু মারা গেছে কিন্তু তিনি এটি জানতেন না। কারণ  অনুসন্ধান করে জানা গেলো শিশুটির ডায়রিয়া হয়েছিল। শিশুটির মা ওরস্যালাইন  কিভাবে বানাতে হয় তা জানতেন না অথবা নিজ থেকেই নিয়মটি হয়তো মানেননি। ফলে শিশুটির শরীরের লবণের মাত্রা ভীষণ রকমের বৃদ্ধি পায়  যার ফলে শিশুটি মারা যায়। একটি ফুটফুটে শিশুর জীবনবাতি চিরতরে নিভে গেল। আমি কোনোভাবেই বলব না এই মায়ের ভালোবাসা, স্নেহ বা ডেডিকেশানের কোনো অভাব ছিল; তবে খুব সম্ভবত জ্ঞান বা সচেতনতার অভাব ছিল। যদিও জীবন-মৃত্যু সবকিছু আল্লাহর ইশারায় হয়, তবুও বোধহয় তিনি নিজেকে কিছুটা অপরাধী ভাববেন।”

আসলে ঘটনাটি কী হয়েছে? সবার বোঝার জন্যে খুব সিম্পলিফাই করে বলা যাক। ওরাল রিহাইড্রেশান সল্টের (যাকে পানিতে মেশানোর পর আমরা স্যালাইন বলছি) মধ্যে থাকে লবণ অর্থাৎ
– সোডিয়াম ক্লোরাইড,
– পটাশিয়াম ক্লোরাইড,
– গ্লুকোজ এবং
– ট্রাইসোডিয়াম সাইট্রেট৷

নিয়ম হচ্ছে আমাদের যে স্যালাইনের প্যাকেটটি পাওয়া যায় তা হাফ লিটার পানির মধ্যে মিশিয়ে খাওয়তে হয়। হয়তো আমরা অনেকেই এই নিয়মটি মানতে চাই না বা জানি না।

এর প্রভাবে কোষ থেকে পানি বেরিয়ে আসবে, বিশেষ করে ব্রেইনের। কোষগুলো নষ্ট হবে। এবং তা থেকে মৃত্যু হওয়া অস্বাভাবিক না৷ যেমনটি হয়েছে এই শিশুর ক্ষেত্রে। সোডিয়াম ক্লোরাইড রক্তে থাকার কথা ১৩৫-১৪৫ মিলিমোল/লিটার, সেখানে শিশুটির হয়ে গিয়েছিল ১৬৫ মিলিমোল/লিটার! তার মা না কি একটু একটু করে সল্ট নিয়ে একটু একটু করে পানিতে মেশাচ্ছিলেন৷ ফলে লবণ পানির যে রেশিওটি মেইন্টেইন করার কথা ছিল তা সম্ভব হয়নি।

ডাক্তার সাহেব তার স্ট্যাটাস এ স্যালাইন বানানোর কিছু টিপ দিয়েছেন।

প্রশ্ন : তাহলে স্যালাইন কীভাবে বানাতে হবে?

উত্তর : হাফ লিটার পানি নিতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় হাফ লিটারের একটা বোতল দিয়ে মেপে নিলে। এবার পুরো প্যাকেটটির সবটুকু ঢেলে দিয়ে মিশিয়ে নিতে হবে৷ এরপর পরিমাণমতো খাওয়াতে হবে।

প্রশ্ন : কী ধরনের পানির সঙ্গে মিশাবো? ডিসটিলড (যাকে মিনারেল ওয়াটার নামে আমরা চিনি)  ওয়াটার না কি আমরা যে পানি খাই সেটা?

উত্তর : আমরা নিয়মিত যে পানি পান করি সেটাই ব্যবহার করব; ডিসটিলড ওয়াটার না। কারণ সে পানিতে বেশ কিছু মিনারেল আছে। ডায়রিয়ার সঙ্গে মিনারেল বেরিয়ে যায় শরীর থেকে।

প্রশ্ন : একটু একটু করে সল্ট পানির সাথে মেশালে হবে কি?

উত্তর : না, হবে না। লবণের তুলনায় পানি কম-বেশি হয়ে যাবে এর ফলে উপরের কেইসের মতো ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তাই পুরোটা একসাথেই বানাতে হবে।

প্রশ্ন : স্যালাইন বানিয়ে কতোক্ষণ রাখা যাবে?

উত্তর : ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত খাওয়ানো যাবে।

প্রশ্ন : ১২ ঘণ্টা পর স্যালাইন রয়ে গেলে সেটা কী করব?

উত্তর : ফেলে দিতে হবে।

প্রশ্ন : টাকা দিয়ে কিনেছি নষ্ট কেন করব?

উত্তর : এটা নষ্ট করা না। এর মধ্যে গ্লুকোজ থাকে। যে পানিতে গ্লুকোজ থাকে তা জীবাণু বেড়ে ওঠার জন্যে বিপজ্জনকভাবে কাজ করে। আর ১২ ঘণ্টা পর সেখানে জীবাণুর সংক্রমণ হবার সম্ভাবনা খুব বেশি। এই স্যালাইন খাওয়ালে শরীরে জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে। তাই এটাকে অপচয় বলা যাবে না।

প্রশ্ন : গ্লুকোজ যখন খারাপই, তাহলে এখানে গ্লুকোজ দেবারই বা কী দরকার ছিল?

উত্তর : একটা মানুষের যখন বারবার লুজ স্টুল পাস হতে থাকে, সে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই গ্লুকোজ তাকে এনার্জি দেয়। তাছাড়া ডায়রিয়ার সময় প্রচুর লবণ বেরিয়ে যায় শরীর থেকে, এখন স্যালাইনের মধ্যে যে লবণ (সোডিয়াম) থাকে তা কোষের ভেতরে ঢোকাতে গ্লুকোজের সহায়তা লাগে।

প্রশ্ন : এতো যখন ঝামেলা তো স্যালাইন বারবার খাওয়াবার দরকার কী? শুনেছি বাজারে ইমোটিল নামে একটা ওষুধ পাওয়া যায় সেটা খেলে না কি ডায়রিয়া বন্ধ হয়ে যায়? সেটা খাইয়ে দিই?

উত্তর : না। ২০ বারের বেশি ডায়রিয়া হলে চিকিৎসকরা এটা দিয়ে থাকেন। তাছাড়া এই ওষুধটার কিছু সমস্যা আছে। ডায়রিয়ার সঙ্গে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ/জীবাণুগুলো বেরিয়ে যায়, এখন আমরা যদি এই ওষুধ দিই তাহলে স্টুল পাস হওয়াই বন্ধ হয়ে যাবে৷ ফলে সেগুলো শরীর থেকে বের হবে না, যা ক্ষতিকর। এছাড়া ছোট বাচ্চাদের ক্ষুদ্রান্ত্রের মুভমেন্ট বন্ধ করে দিয়ে ‘প্যারালাইটিক আইলিয়াস’-এর মতো ভয়াবহ অবস্থা করতে পারে।

আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন সবসময়। মনে রাখবেন আপনার চিকিৎসক আপনার আপনজন। কোনো চিকিৎসকই কোনোভাবেই চান না তার রোগী খারাপের দিকে যাক। এটা তার জন্যে গ্লানিকর। না জানা দোষের কিছু না, জানতে চেষ্টা না করা দোষের কিছু হবার সম্ভাবনা বেশি।

স্ট্যাটাসটি ডা. মারুফ রায়হান খান এর ফেইসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া

বাংলা ক্যালেন্ডার